সন্ধ্যা ৬:০৫ - ২৬শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং

সাতকানিয়ায় করোনা রোগীর সেবায় ‘আমরা ছমদর পাড়া বাসী’

সাতকানিয়ায় করোনা রোগীর সেবায় ‘আমরা ছমদর পাড়া বাসী’

সাতকানিয়া প্রতিনিধিঃ

‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ কিংবা ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ মানব সেবার এবং আর্তমানবতার সেবার আহ্বান সম্বলিত এ মহান কাব্যিক কথাগুলো সর্বকালে সর্বস্তরের মানুষের মনে দাগ কাটলেও বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ সংক্রমনকালীন সময়ে বহু মানবতাবাদী যারা সর্বদা আর্ত মানবতার সেবার শ্লোগান দিতেন তারাও শেষমেশ নিজের অবস্থান থেকে সরে গিয়েছেন। সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার ভালবাসা কিংবা পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা আর ভালবাসার এ চিরন্তর সত্যও করোনাকালীন সময়ে মিথ্যায় পর্যবসিত হয়েছে। এমনকি স্বামী-স্ত্রী’র অকৃত্রিম ভালবাসায় কৃত্রিমতার কলঙ্ক লেপন করে দিয়েছে করোনা ভাইরাস।

কোভিড-১৯ এর আক্রমন আর সংক্রমনের ভয়ে যেখানে সকল প্রেম প্রীতি ও ভালবাসা এবং মানবতার ধ্বজাধারী মানবতাবাদীরা কোপোকাত ঠিক তেমনি সময়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শ্লোগান বিহীন কিছু মধ্য বয়সী যুবক এবং কিছু প্রবীন এগিয়ে এসেছে করোনা আক্রান্তদের সেবা দেয়ার মানসে। যার আত্মপ্রকাশ ‘আমরা ছমদর পাড়াবাসী’ নামে সেচ্ছাসেবী সংগঠন। সাতকানিয়া পৌর সদরের ৪নং ওয়ার্ডের সর্বস্তরের জনগোষ্ঠি এ সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ১৮জন শিক্ষিত যুবকই মূলত করোনা আক্রান্তদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মানব সেবার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে এ ১৮ জনেই প্রানপন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা সকলেই বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থী বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষক। তাদের মুরুব্বী হিসেবে তদারকি বা দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন সাতকানিয়া পৌর সভার আল-মাদ্রাসাতুল আরবিয়াতুল হফেজিয়াহ কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও মুহতামিম। যা পুরো সাতকানিয়া এলাকায় ছমদরপাড়া বড় মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত।

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন ও সেবামুলক কাজে জড়িত থাকলেও দেশে করোনা ভাইরাসের আক্রমন ও সংক্রমনের পূর্ব পর্যন্ত তাদের এ জনহিতকর কর্মকান্ড সম্পর্কে এলাকার সাধারন মানুষের কাছে অজানাই রয়ে যায় । দেশে কোভিড-১৯ এর সংক্রমন শুরু না হলে হয়ত তাদের এ মহৎ কাজ অপ্রকাশিত থেকে যেত। ‘আমরা ছমদর পাড়াবাসী’ সংগঠনের ব্যাতিক্রমী একটা বৈশিষ্ট হচ্ছে সংগঠনের সকল সদস্যই প্রচারবিমুখ। রোগাক্রান্তদের সেবা দিয়েই তাদের মানব সেবার সূচনা। প্রথমদিকে এ সংগঠনে শ্বাসকষ্টের রোগিকে নেবুলাইজার দিয়ে সেবা দিত। এ স্বাস্থ্য সেবা চলমান অবস্থায় দেশে আসে করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাব। করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তিদের যখন দাফন কাফন থেকে সবাই বিরত থাকছে। তখন ‘আমরা ছমদর পাড়াবাসী’ সংগঠনের সদস্যরা স্বীকৃত করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিদের দাফন কাফনের কাজ শুরু করেন। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তির দাফন কাফন সম্পন্ন করেছেন তন্মধ্যে ১ জন করোনা আক্রান্ত রোগি হিসেবে সরকারিভাবে স্বীকৃত। বর্তমানে তাদের এ কার্যক্রম পৌরসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং পুরুষ ব্যক্তির দাফন কাফন করা হয়ে থাকে বলে জানান, হাফেজ হারুন বিন রশীদ। পরবর্তীতে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পুরো উপজেলার পুরুষ ও –মহিলা মৃতের দাফন কাজের পরিধি বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।

এদিকে কোভিড-১৯ আক্রান্তরা যখন ব্যপক আকারে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন ঠিক তখনই “আমরা ছমদর পাড়াবাসী” সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক দল বিনামূলে অক্সিজেন সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপর থেকে শুরু হল শ্বাসকষ্টে করোনা রোগি যাদের অক্সিজের লেভেল নীচে নেমে যাচ্ছে তাদেরকে বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করে নিঃশ্বাস নিশ্চিত করা। ক্রমান্বয়ে ‘আমরা ছমদর পাড়াবাসী’ সংগঠন পুরো উপজেলার কোভিড রোগিদের নিঃশ্বাসের বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয় । মাঝপথে কয়েকমাস করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও তাদের সেবায় কোন ধরনের কমতি হয়নি।

জানা যায়, ৪টি অক্সিজের সিলিন্ডার দিয়ে এ সংগঠনের কোভিড রোগির সেবার যাত্রা শুরু হয়। সাতকানিয়া এলাকায় করোনা রোগির তালিকা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের অক্সিজেন সরবরাহের পরিধিও বাড়তে থাকে। বর্তমানে এ সংগঠন কোভিড রোগী ছাড়াও যেকোন শ্বাসকষ্টের রোগীদের অক্সিজেন ও নেবুলাইজার সেবা দিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ‘আমরা ছমদরপাড়া বাসী’ সংগঠনের পক্ষ থেকে করোনা আক্রান্তসহ বিভিন্ন ধরনের ৪১ জন রোগীদের বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করেছেন। তন্মধ্যে একজন রোগীকেই বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে ৫৭টি অক্সিজেন সিলিন্ডার।

এক প্রশ্নের জবাবে সংগঠনের অপর কর্ণধার হাফেজ শুয়াইব বিন হাছন একজন করোনা আক্রান্তের অক্সিজেন প্রয়োজন হলে তা’ কোন সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, যতক্ষন এবং যতটি প্রয়োজন হবে আমাদের সংগঠন তা সরবরাহ দিতে বদ্ধপরিকর। ‘আমরা ছমদরপাড়া বাসী’ সংগঠনের এ মানবসেবা কার্যক্রম পরিচালনার মূলকেন্দ্র সাতকানিয়া আল-মাদ্রাসাতুল আরবিয়াতুল হাফেজিয়াহ (ছমদরপাড়া বড় মাদ্রাসা)। ওখান থেকে রোগীদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সিলিন্ডার ও নেবুলাইজার সরবরাহ হয়। উপজেলার অঁজপাড়া গাঁ কিংবা দূরদূরান্তের রোগীদের সরবরাহ সুবিধার্থে সাতকানিয়া রাস্তার মাথা ও পৌরসদরে আরো দু’টি সাব-ষ্টেশন করা হয়েছে। সংগঠনের এ কার্যক্রম পরিচালনা সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালন করছেন হাজী জাফর আলম, হাফেজ হারুন বিন রশীদ ও হাফেজ শুয়াইব বিন হাছন। তারা জানান, রাত গভীরে যখনই আমাদের রোগীর অভিভাবকরা ফোন দিবেন তখনই আমার সেবা দিতে প্রস্তুত থাকি।

জানা গেছে, সাতকানিয়ার বাসিন্দা ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জের প্রতিষ্ঠিত (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)এক ব্যবসায়ী মানবসেবার জন্য ‘আমরা ছমদর পাড়াবাসী’ সংগঠনকে সকল আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছেন। আজ থেকে দীর্ঘ কয়েক বৎসর আগে ওই ব্যবসায়ী পিতাও রক্তে অক্সিজেনের অভাবজনিত কারনে মৃত্যু বরণ করেন। সে দূর্বলতা থেকে ওই ব্যবসায়ী শ্বাসকষ্টে অক্সিজেনের অভাব পূরনে রোগিদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ব্যবসায়িক ব্যস্থতার কারনে তিনি সরাসরি সেবায় জড়িতে না হলেও আর্থিকভাবে সকল সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া তিনি ওই সংগঠনের অক্সিজেন গ্রহনকারী সকল রোগিদের নিয়মিত খোঁজখবর নেন।