রাত ৮:২৩ - ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

বিপদ – মসিবত ও মহামারীতে মুমিনদের করণীয়

বিপদ – মসিবত ও মহামারীতে মুমিনদের করণীয়

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন
” এবং অবশ্যই আমি তোমাদেরকে  পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।”
সূরা বাকারা : ১৫৫।

বোঝা গেল, বিপদ আসবেই। পবিত্র কুরআনের এ দ্ব্যর্থহীন ঘোষণায় তো সন্দেহের অবকাশ নেই। পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে জীবনের নানা ক্ষেত্রে।  সেই পরীক্ষায় সফল হওয়ার মূলমন্ত্রও ঘোষিত হয়েছে পাক কুরআনেই। সফলতার সেই মূলমন্ত্রের নামই সবর বা ধৈর্যধারণ।

হে মুমিন গন! তোমরা ধৈর্য্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিতই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন। (সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৩)

💥বিপদ মসিবতে আমাদের করণীয়

ক. যাবতীয় অশ্লীল কাজ বর্জন করে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। কারণ রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারি আকারে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তা ছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)

খ.বিপদ, দুঃশ্চিন্তা এবং হতাশা দূর করার জন্য আমাদের মহানবী (স.) পড়তেন- لا إِلَهَ إِلّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ ‘লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায্যালেমীন। (তিরমিযী)

গ.দোয়া-রাব্বি আন্নি মাস্‌সানিয়াদ্দ্বুর্‌রু ওয়া আন্তা আরহামুর্‌ রাহিমিন। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত : ৮৩)

ঘ. বেশি করে তওবা ইস্তেগফার করা।  আল্লাহর স্মরণ ও যিকির বেশি বেশি করা।
হাদিসে বর্ণিত দুয়ার আমলগুলোও করা যেতে পারে।

ঙ. আল্লাহুম্মা ইন্নি আঊযুবিকা মিনাল বারাসি ওয়াল জুনূনি ওয়াল জুযামি ওয়া মিন সায়্যিইল আসক্বামি।
🔹আবু দাউদ: ১৫৫৪।

চ. বেশি বেশি দান-সাদকা ও মাতা-পিতার সেবা করা, পরিবারের লোকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। নবী (সা.) বলেন, দান-সাদকা ও সৎ কর্ম অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে।

ছ. আল্লাহর সুপ্রসস্থ রহমতের উপর আস্থাবান থাকা।তাহার উপর পূর্ণভরসা করা, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে  ধৈর্য্যধারণ করা, বিভিন্ন নেক আমলের মাধ্যমে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য আল্লাহর দ্বারস্থ হওয়া

জ. তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করে  আল্লাহ তায়ালার দরবারে রোনাযারি ও কান্নাকাটি করে দোয়া করা।

🎆 ইসলামের ইতিহাসে সংঘটিত কিছু  মহামারী এবং এর  থেকে আমাদের শিক্ষাঃ-
১.  সাহাবা কিরাম (রা.)-এর যুগে মহামারীতে যেসব কাজ করা হতো তার বর্ণনাও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা রয়েছে যে, উমর (রা.) সিরিয়ার দিকে রওনা হন। ‘সারগ’ পর্যন্ত পৌঁছালে ‘আজনাদ’ অধিবাসীর প্রধান আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.) ও তার সহকর্মীরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন তারা জানালেন যে, সিরিয়ায় মহামারী শুরু হয়ে গেছে। উমর (রা.) তখন লোকদের মধ্যে ঘোষণা দেন, ‘আমি ফজর পর্যন্ত সওয়ারির ওপর থাকব, তোমরাও বাহনের ওপর অবস্থান করো।’ তখন আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) বললেন, আল্লাহর তকদির থেকে পলায়ন করে? তখন উমর (রা.) বলেন, ‘হে আবু উবায়দা! হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর তকদির থেকে আল্লাহরই তকদিরের দিকে পলায়ন করছি। তোমার যদি একপাল উট থাকে আর তুমি একটি উপত্যকায় অবতীর্ণ হওয়ার পর দেখো যে দুটি প্রান্তর রয়েছে, যার একটি সবুজ শ্যামল, অন্যটি শূন্য। সে ক্ষেত্রে তুমি যদি সবুজ শ্যামল প্রান্তরে (উট) চরাও, তাহলে আল্লাহর তকদিরেই সেখানে চরাবে, আর যদি তৃণশূন্য প্রান্তরে চরাও, তাহলেও আল্লাহর তকদিরেই সেখানে চরাবে।’ বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় আবদুর রাহমান ইবনে আউফ (রা.) এসে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে হাদিসের জ্ঞান রয়েছে। আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা কোনো এলাকায় এর সংবাদ শুনতে পাও তখন তার ওপর দুঃসাহস দেখিয়ে এগিয়ে যেয়ো না। আর যখন কোনো দেশে তোমাদের সেখানে থাকা অবস্থায় দেখা দেয়, তখন তা থেকে পলায়ন করে বেরিয়ে পড়ো না।’ বর্ণনাকারী বলেন, তখন উমর (রা.) আল্লাহর প্রশংসা করেন। এরপর চলে গেলেন।🔹মুসলিম, হাদিস : ৫৫৯১)

🌀 মহামারী বিস্তারের অনুকূল অবস্থা ও প্রেক্ষাপট

সিরিয়ায় মুসলিম ও রোমান বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক রোমান সেনা নিহত হয়। মুসলিম সেনাদের লাশ দাফন করার ব্যবস্থা হলেও রোমানদের লাশ দাফন করা হয়নি। জনমানবহীন বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে তাদের অগণিত লাশ। লাশ পঁচে-গলে একটু একটু করে দূষিত হতে থাকে আবহাওয়া আর জলাধার। এতে করেই সেখান থেকে সৃষ্ট নানা জীবাণু বিস্তার লাভ করে এবং মহামারীর রূপ ধারণ করে। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের এমন মতামতই তুলে ধরেছেন সময়ের বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ড. আলী আস-সাল্লাবি ও ড. রাগিব আস-সিরজানি।

ইবন হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘এটা ছিল শরীরে এক ধরনের ফোসকা ও একটু বড় টিউমারের মতো।’ এই রোগে কেউ আক্রান্ত হলে পাঁচ দিনের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে তখন সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মুসলিম সেনা যুদ্ধ করছিলেন। তাদের ৮০ শতাংশ সেই মহামারীতে ইন্তেকাল করে শহীদের মর্যাদা লাভ করেন।

আবু উবায়দা (রা.) ও উমার (রা.)-এর মধ্যে পত্রবিনিময়:

মহামারীর সময়ে সাহাবি আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) ও উমর (রা.)-এর মধ্যে মর্মস্পর্শী পত্রবিনিময়ের কথা ইতিহাসে বিখ্যাত। অবশেষে মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) নিজেও এই মহামারীতে আক্রান্ত হন। শেষে সহচরদের এই বলে উপদেশ দিতে দিতে ইন্তেকাল করেন যে, ‘হে লোকসকল! এটা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে রহমত। তোমাদের নবীর দোয়ার প্রতিফল।’

আবু উবায়দা (রা.)-কে দাফন শেষে মুয়াজ (রা.) ভাষণ দিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার! তোমরা সবাই আল্লাহর সমীপে  তওবা করো। কারণ যে বান্দা প্রকৃত তওবা করবে, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রাপ্ত অবস্থায়, আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। আমার ভাইয়েরা! তোমাদের কারও ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করে দিয়ো…’

কিন্তু মহান রবের ফায়সালায় সামান্য সময়ের ব্যবধানে মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। উমর (রতারিখঃ

🌀 মহামারী বিস্তারের অনুকূল অবস্থা ও প্রেক্ষাপট

সিরিয়ায় মুসলিম ও রোমান বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক রোমান সেনা নিহত হয়। মুসলিম সেনাদের লাশ দাফন করার ব্যবস্থা হলেও রোমানদের লাশ দাফন করা হয়নি। জনমানবহীন বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে তাদের অগণিত লাশ। লাশ পঁচে-গলে একটু একটু করে দূষিত হতে থাকে আবহাওয়া আর জলাধার। এতে করেই সেখান থেকে সৃষ্ট নানা জীবাণু বিস্তার লাভ করে এবং মহামারীর রূপ ধারণ করে। প্রাচীন ঐতিহাসিকদের এমন মতামতই তুলে ধরেছেন সময়ের বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা ড. আলী আস-সাল্লাবি ও ড. রাগিব আস-সিরজানি।

ইবন হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘এটা ছিল শরীরে এক ধরনের ফোসকা ও একটু বড় টিউমারের মতো।’ এই রোগে কেউ আক্রান্ত হলে পাঁচ দিনের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.)-এর নেতৃত্বে তখন সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মুসলিম সেনা যুদ্ধ করছিলেন। তাদের ৮০ শতাংশ সেই মহামারীতে ইন্তেকাল করে শহীদের মর্যাদা লাভ করেন।

আবু উবায়দা (রা.) ও উমার (রা.)-এর মধ্যে পত্রবিনিময়

মহামারীর সময়ে সাহাবি আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) ও উমর (রা.)-এর মধ্যে মর্মস্পর্শী পত্রবিনিময়ের কথা ইতিহাসে বিখ্যাত। অবশেষে মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ (রা.) নিজেও এই মহামারীতে আক্রান্ত হন। শেষে সহচরদের এই বলে উপদেশ দিতে দিতে ইন্তেকাল করেন।  উমর (রা.) যখন এই সংবাদ শুনলেন, তখন কান্নায় তার দাড়ি ভিজে গিয়েছিল। তারপর তিনি ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানকে পরবর্তী দায়িত্বশীল করে সেখানে পাঠান।

এই মহামারীতে শহীদদের মধ্যে রাসুল (সা.)-এর চাচাতো ভাই ফুজাইল ইবনে আব্বাস, আবু জান্দাল বিন সুহাইল, হারিস ইবনে হিশাম, আবু মালিক আশআরিসহ অনেক প্রথম সারির সাহাবি শাহাদতবরণ করেন। এতে সাহাবায়ে কিরাম যতটুকু বিপর্যস্ত হয়েছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি দীনের ওপর অবিচল থেকেছেন।

🎆২২১ হিজরিতে বসরায় আরও একটি মহামারি আঘাত হানে, এতে এত বেশি পরিমাণে লোক মারা যায় যে, বলা হয়ে থাকে, কারও যদি সাতটি সন্তান থাকলে গড়ে পাঁচজনেরই মৃত্যু হয়েছে। (বাজলুল মাউন ফি ফাদলিত ত্বাঊন, পৃষ্ঠা : ৩৬১-৩৬৪)

ইসলামের ইতিহাসে মহামারীর তালিকা অনেক দীর্ঘ। এখানে দুই একটা মহামারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে ইবনে হাজার আসকালানির “বাজলুল মাঊন ফি ফাজলিত ত্বাঊন”গ্রন্থটি দ্রষ্টব্য।

💥ইতিহাসে সংঘটিত এসব মহামারীতে যেমন মুসলমানদের জান ও মালের ক্ষতি হয়েছে, তেমনি ইমান, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিকতার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। কাজেই করোনা মহামারীতে ভীত না হয়ে নবীর নির্দেশনা মোতাবেক সতর্কতা-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই যুক্তিযুক্ত। পাশাপাশি মহান আল্লাহর কাছে সব ভুলত্রুটির জন্য তওবাও জরুরি।

পরিশেষে আল্লাহর শাহী দরবারে ফরিয়াদ করি,
হে আল্লাহ! আপনি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল মানব জাতিকে, বিশেষ করে দেশের সকল মানুষসহ  আমাদের  বিবি-বাচ্চা, মাতা-পিতা এবং আত্মীয়-স্বজনকে করোনাভাইরাসসহ সকলধরণের বালাই-মছিবত থেকে হেফাযত করুন। এবং বিপদে ধৈর্য ধারনসহ ইমান আত্মশুদ্ধির তাওফিক  দান করুন।
আমীন ইয়া রব্বানা🤲।

✍লেখক : ইসলামি গবেষক
( প্রাক্তন শিক্ষার্থী, হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)