সন্ধ্যা ৬:০৯ - ২৬শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং

এবার ভাস্কর্য বিরোধীদের এক হাত নিলেন আহলে সুন্নাত মহাসচিব

এবার ভাস্কর্য বিরোধীদের এক হাত নিলেন আহলে সুন্নাত মহাসচিব
আলী আবরার, বিশেষ প্রতিনিধি 
সরকার ও প্রগতিশীল বিভিন্ন মহলের মতো এবার চলমান ভাস্কর্য ইস্যুতে মুখ খুললেন আহলে সুন্নাত নির্বাহী মহাসচিব আল্লামা আবুল কাশেম মুহাম্মদ ফজলুল হক। তিনি ভাস্কর্য বিরোধীতার নামে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী দেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতি নষ্ট করছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
রবিবার ( ২৯ নভেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এই বিবৃতিতে তিনি একই সাথে ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনের নামে দেশকে অস্থিতিশীল কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে আহবান জানান।
মাওলানা আবুল কাসেম বলেন, গত কিছুদিন থেকে ভাস্কর্য ইস্যু টক অব দ্য কান্ট্রি। উত্তপ্ত এই ইস্যু নিয়ে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম। বিশেষ ঘরানার জনৈক আলেমের জ্বালাময়ী বক্তব্যকে ঘিরে নাটকীয় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মিডিয়ার প্রচারে এই ইস্যু নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও অনেক আগ্রহ, আবেগ এবং নানা ধরনের প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
 রাজধানীর  মোহাম্মদপুর ঢাকা কাদেরীয়া মাদ্রাসার এই উপাধ্যক্ষ বলেন,পবিত্র কুরআনে কারীম এবং হাদীস শরীফের নির্দেশনা অনুসারে ইসলাম ধর্মে কোন প্রাণীর মূর্তি ও ভাস্কর্য নির্মাণ করা হারাম তথা নিষিদ্ধ। তা পূজার জন্য হোক কিংবা সৌন্দর্যের জন্য অথবা ঐতিহ্যগত কারণে। আহলে সুন্নাতের ওলামায়ে কেরাম তাই মনে করে এবং বিশ্বাস করে। এবং কাউকে স্মরণীয় করে রাখতে আরও অনেক কর্মুসূচী আছে তাও মনে করে।
তিনি বলেন,  পৃথিবীর অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও ভাস্কর্য নির্মাণ আজকে নতুন করে শুরু হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় মোড়, টিএসসি’র সামনে, এবং দোয়েল চত্বরসহ দেশের অনেক জেলা ও থানা শহরের মোড়ে মোড়ে অসংখ্য প্রাণীর ভাস্কর্য স্থাপন করা আছে যুগের পর যুগ ধরে। শুধু বর্তমান সরকারই নয়; পূর্বের সরকারগুলোও একই কাজ করেছে। শুধুমাত্র ঢাকা শহরের মোড়ে মোড়েই অনেক প্রাণীর ভাস্কর্য আছে। কাকরাইল মসজিদের সামনের মোড়েও পাখির ভাস্কর্য শোভা পাচ্ছে বহু বছর ধরে।  আর তা হুংকারদাতাদের দৃষ্টির আড়াল হবার কথা নয়।
 মাওলানা  ফজলুল হক বলেন,  দেশে তাদের অনেক মাদ্রাসার কাছাকাছি দূরত্বে অনেক প্রাণীর ভাস্কর্য আছে, যা সকাল সন্ধা তারা দেখে। টুঙ্গিপাড়ায় ভাস্কর্যের সামনে হুংকারদাতাদের সগোত্রীয়রা বছরের পর বছর দোয়া-মোনাজাত করে আসছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্টজনদের ভাস্কর্য দেশের বিভিন্ন স্থাপনায় অনেক আছে। সে সকল ব্যক্তিদের আদর্শের দলের সাথে হুঙ্কার দাতাদের মধুর সখ্যতার কথাও সকলের জানা। এভাবে অতীতের স্থাপিত ভাস্কর্যের ফিরিস্তি তুলে ধরতে গেলে অনেক লম্বা হবে।
তরিকত পন্থীদের এই শীর্ষ নেতা বলেন , অতীতের এত এত বিশিষ্টজন ও বিভিন্ন প্রাণীর ছবি এঁকে ভাস্কর্য নির্মিত হলো বছরের পর বছর ধরে। অথচ এমন কোন হুংকার তো আমরা আগে দেখিনি কিংবা শুনিনি। রাষ্ট্রকর্তৃক ধারাবাহিক ভাস্কর্য নির্মাণের স্পর্শকাতর একটা জায়গা এসে হঠাৎ হুংকার এবং আন্দোলন সচেতন মহলে তাই অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষ তাই  অতীতের ধারাবাহিক ভাস্কর্য নির্মাণের সময় নীরব থেকে এখন হঠাৎ সরব হওয়ার কারণ জানতে চায়।
মাওলানা ফজলুল হক বলেন, সময়ের ভিন্নতায় ফতোয়া দেয়ার ক্ষেত্রে এমন বৈষম্য প্রকারান্তরে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও নাস্তিক্যবাদকে উস্কে দিয়ে ইসলাম সম্পর্কে বিশেষ গোষ্ঠীর অযাচিত মন্তব্য করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আলেমদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের জন্ম দেয়। এটা এখন যেমন হারাম, আগেও তো তেমনি হারাম ছিলো। তাহলে বর্তমান স্পর্শকাতর জায়গায় এসে হারামের ফতোয়া নিয়ে হঠাৎ  হুংকার দেয়া কোনভাবেই বোধগম্য নয়।
তিনি বলেন, চলমান ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলন গোষ্ঠি মহলের স্বার্থ আদায়ের  দুরভিসন্ধি ছাড়া আর কিছু নয়। রেলওয়ের জমির মতো  সরকার থেকে অন্য কোনো স্বার্থ উদ্ধার কিংবা ৫ই মের মতো নারকীয় কোন তাণ্ডব সৃষ্টির উদ্দেশ্য তারা এইসব আন্দোলনের নামে মাঠ গরম করতে পারে।
মাওলানা ফজলুল হক বলেন, মূলত আগেকার নিরবতা এবং বর্তমানকার হঠাৎ গর্জনের দুর্বোধ্য কারণসহ উপরের নানাবিধ প্রশ্নের কারণে দেশের হক্কানি ওলামায়ে কেরাম নীতিগতভাবে ভাস্কর্য নির্মাণ নিষিদ্ধ বিশ্বাস করার পরও এই হুংকার দাতাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দিহান। এবং এহেন কারণে দু’একটি দল ছাড়া বাংলাদেশের বাকি অসংখ্য ইসলামী দল এ ব্যাপারে এখনো কোনো কর্মসূচি প্রদান করেনি। অতীতের নীরবতার পর স্পর্শকাতর জায়গায় এসে গোষ্টি বিশেষের দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্যে ও আস্ফালনে তৈরি হওয়া ইস্যু নিয়ে সচেতন মহলও পর্যবেক্ষণে আছে।
এই তরিকত নেতা বলেন, সুন্নি ওলামায়ে কেরাম তাদের এই হুংকার ও আস্ফালন সম্পর্কে সচেতন। কারণ কিছুদিন আগেও এই চিহ্নিত মহল দেশের মাজার ও খানেকাগুলো ভেঙ্গে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল। মাজার ও খানেকা ভাঙ্গার হুংকারে মিডিয়া কাভারেজ না পেয়ে অবশেষে ভাস্কর্য ইস্যুকে বেছে নিল। হারাম কাজ বন্ধ করাই যদি উদ্দেশ্য হয় তাহলে সুদ ঘুষ মদ-জুয়াসহ দেশের বিভিন্ন সেক্টরে হাজার হাজার হারাম কাজ সমাজে চলমান। ওগুলো নিয়ে তেমন আস্ফালন দেখা যায় না যতটা মাজার ও খানেকা নিয়ে দেখা যায়।
ভাস্কর্য বিরোধীদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে আহলে সুন্নাত নির্বাহী মহাসচিব বলেন,  দেশের সুন্নী  আলেম ওলামা তাদের এই আস্ফালন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে প্রয়োজন হলে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতেও পিছপা হবে না।