রাত ২:০৫ - ১৭ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং

স্বাধীনতা দিবসের শপথ

print
বাংলাদেশ, একটি দেশ, একটি ইতিহাস। ১৭৫৭ সালের বীজ বুনে কালের আবর্তনে নিয়মভাঙা ঝড়ের মত শত বছরের সংগ্রাম শেষে ৭১ এ পেয়েছি পরিপুর্ণ ফসল।এই দেশ আমার মা,আমার মাটি। যে মাটির গন্ধ লেগে আছে আমার শরীরে আমার গ্রামে- গঞ্জে।
আমার বাবা, যাঁর রক্ত লেগে আছে পোশাকে, বন্দুকের নলে। বাবা যখন ছোট, পিতামাতার একমাত্র ছেলে। নতুন বিয়েও করেছেন। কিন্তু তখনই বেজে উঠে যুদ্ধের দামামা। যে যুদ্ধ ছিল মুক্তির, ছিলো শোষণের বিরুদ্ধে। ছিলো অধিকার আদায়ের হুঙ্কার।
বাবা ঘরে বসে থাকার লোক নয়। তাই মায়ের বারণ, নতুন বোউয়ের ভালোবাসাকে উপেক্ষা করে চলে যান রণাঙ্গণে। ছুটে যান ভারতে যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। বাবার ইচ্ছা দেশ স্বাধীন করে সবাই মিলে মিশে থাকবে। থাকবে না কোন ভেদাভেদ। সকলে মিলে মিশে স্বাধীন সমাজ গঠন করার। কিন্তু আজ স্বাধীন দেশে পরাধীনতার কালো আখড়ায় যেন পরিনত হয়েছে।
বাবাতো যুদ্ধ করে নি ভাইয়ে ভাইয়ে কোলাহলের গুঞ্জরণ রটাতে। যুদ্ধ করেনি ভোরে ঘুম থেকে উঠতে দেখা ভাইয়ের বুকে গুলি চালাতে, তার মতামতকে কণ্ঠরোধ করতে? যুদ্ধ করেনি রাজনীতির রোষানলে ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ ঘটাতে!!
হ্যাঁ- বাবার যুদ্ধ ছিল-নিছক সম্প্রীতির। তাঁর যুদ্ধ ছিল- মুয়াজ্জিনের আজানে যেমন সারি বদ্ধ হয়ে কামার কুমোর চাষা কিংবা রিক্সাওলা কাকাদের সাথে নামাজ পড়তে। তেমনি পশ্চিম বাড়ির কৃষ্ণদাদের পুজোতে একটু সন্দেশ খাওয়ার। ছিলো দোকানে গিয়ে চা- পানের আসরে গাল ভরে হাসার। ছিল না কোন ভয়ভীতির ত্রস্ত।
তারাইতো গ্রামের মানুষ। তারা জানে না রাজনীতি। জানে শুধু দিনের বেলায় কঠোর পরিশ্রম, আর সন্ধ্যা হলে সবাইকে নিয়ে চায়ের দোকানে আড্ডার আসর গুজতে।এতেই তাদের জীনের সুখ খুঁজে নেয়।
কিন্তু! আজ কেন সেই গ্রাম ভীতসন্ত্রস্ত! কেন কারো বুকে চাপা কান্না? কেন আজ এপাড়ার ছেলে ওপাড়ার ছেলের সাথে বেজে ওঠে অস্ত্রের দামা? কেন আজ শিশুরা হচ্ছে মাদকাসক্ত! ডিজিটালের খপ্পরে পড়ে নষ্ট করছে তাদের ক্যারিয়ার!
আমরা সবাই ছিলাম সবার তরে। তারাইতো আমার জন্মের সময় অানন্দে দেখতে গিয়েছে। তারাই ছিলো আমার শৈশবে আম কুড়োনো, পাখির বাসা ভাংগার সাথি। কৈশোরে ডাঙ্গুলি, গোল্লাছুট কিংবা কানা মাছি খেলার সঙ্গী। তাদের সাথে আমার বেড়ে ওঠা। ফের তারাই আমাকে জানাজা পড়িয়ে শেষ বিদায় দিবে। কেনই বা তাদের সাথে আমার যুদ্ধাংদেহি মনোপোষণ? কেন তাদের দিন দিন দূরে ঠেলে দিচ্ছি। তারাইতো আমার আপদ- বিপদে কাছে টেনে নেয়।
আমি সেই গ্রাম চাই যেখানে হিন্দু মুসলিম ভেদাভেদ ভুলে সম্প্রীতির বাঁধনে জড়িয়ে থাকবে। সেই গ্রাম চাই, যেখানে বৃদ্ধদের সম্মান করতে শিখবে। শিখবে ছোটদের স্নেহ করতে। সেই গ্রাম চাই যেখানে মানুষ মানুষের কাজে এগিয়ে আসবে। কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে নেমে যাবে দেশের কাজে। সেই গ্রাম চাই সেখানে থাকবে সড়ক নিরাপদ, হবে না নারীদের সম্ভ্রম। সেই গ্রাম চাই যেখানে হত দরিদ্র চাচামিয়া মনের সুখে অন্তত একটু বিড়ির সুখ টানটা নিতে পারবে।
আজ স্বাধীনতা দিবস। কতটুকু হয়েছি স্বাধীন!! স্বাধীনতার মাস মার্চ। এই মাসটি মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে রক্তের আখরে লেখা গৌরবোজ্জ্বল একটি মাস। এই মাসেই ৩০ লাখ শহীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। হাজার বছরের শত সংগ্রাম পেরিয়ে শোষণ-বঞ্চনার শাপমুক্ত হওয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল এই মাসেই ৪৮ বছর আগে ১৯৭১ সালের আজকের এ দিনটিতে আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের। পাকিস্তানি শোষকদের কবল থেকে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আমার ভাই,আমার বোন আমার প্রিয়তম পিতা, আমার শ্রেষ্ঠ বীর সেনানীরা। ৯ মাস বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ফিরে পায় স্বাধীন পতাকা।
আজকের এই দিনে পুরো জাতি শোক ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে অবনতচিত্তে স্মরণ করে।স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের এবং ৯ মাসে অসামান্য আত্মত্যাগকারী বাংলার অকুতোভয় বীর সেনানী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি। পাশাপাশি দেশ আজ মেতে উঠে স্বাধীনতার উৎসবের আমেজে।
৭মার্চ এর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেয়া হয়। সে ঘোষণায় সেদিনই ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৯ মাস চলা মুক্তিযুদ্ধে একদিকে রচিত হয় ইতিহাসের মহীয়ান অধ্যায়, মুক্তিকামী বাংলার মানুষের বীরত্বগাথা; আরেকদিকে ছিল হানাদার বাহিনীর নির্বিচার হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজের কলঙ্কিত অধ্যায়। ৩০ লাখ মানুষের রক্ত আর স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
রক্তঝরা এ মাসে শপথ করি মুখে নয় কাজেই আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই, কে করছে আর কে করছে না, তা না দেখে আমিই সর্বপ্রথম এগিয়ে আসি। আমি একজন নিয়েই ষোল কোটি মানুষ। আসুন দেশ গড়ার কাজে আমিই প্রথমে নেমে যাই। আমিই অন্যায় -অবিচার, ঘুষ ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকি, আমার কাজের প্রতি দায়িত্ববান হই। তবেই পাবো সত্যিকারের স্বাধীন বাংলাদেশ।।
 
জহিরুল ইসলাম জুয়েল
শিক্ষক,  ক্যান্টনমেন্ট  ইংলিশ স্কুল এন্ড কলেজ
print