বিকাল ৫:৫১ - ৭ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

‘ছেলেধরা’ নামে সারাদেশে কি হচ্ছে এসব !

print

 ভোলার লালমোহন থানার মগিয়া বাজার এলাকার সিরাজ মিয়া। বাকপ্রতিবন্ধী  এই যুবক স্ত্রী শামসুন্নাহার ও ৬ বছরের  মেয়ে  অঞ্জুকে নিয়ে থাকতেন নারায়ণগঞ্জের সাইলো এলাকায় । সেখানে রাজমিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে কাজ করতেন  সিরাজ।

অনেকটা সুখেই কাটছিলো তাদের সংসার। তবে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে স্ত্রী শামসুন্নাহার  পাশের এলাকার আব্দুল মান্নান সোহেল নামে এক যুবকের সাথে পরকীয়ায় জড়ান । একপর্যায়ে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বামী সিরাজকে তালাক দিয়ে সোহেলের সাথে পালিয়ে যান শামসন্নাহার। যাওয়ার সময় সাথে মেয়ে অঞ্জুকেও সাথে নিয়ে যায় তারা।

এদিকে স্ত্রী ও আদরের মেয়েকে হারিয়ে অনেকটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন সিরাজ। সারাক্ষণ মেয়েকে খোঁজে বেড়াত ।স্থানীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়,কোন বাচ্চাকে দেখলেই “অঞ্জু” বলে আদর করতো সে। এক পর্যায়ে  কয়েকদিন আগে  সিদ্ধিরগঞ্জের আল আমিন নগর এলাকায় মেয়ের সন্ধান পান সিরাজ। সেখানের একটি  বস্তিতে শামসুন্নহার সিরাজের আদরের  মেয়ে অঞ্জুকে নিয়ে নতুন স্বামী সোহেলের সাথে থাকতো।

 

এদিকে মেয়ের খোঁজ পেয়ে খুশিতে আত্মহারা সিরাজ  শনিবার (২০জুলাই) সকালে আল আমিন নগরের ওই বস্তিতে যান। যাওয়ার সময় পরিচিত এক দোকানির কাছ  থেকে ১০০ টাকা নিয়ে মেয়ের জন্য চুড়ি ও লিপিস্টিক নিয়ে যান। তবে এই খুশিতে বেশিক্ষণ থাকলো  না  সিরাজের। এক পর্যায়ে প্রতারক স্ত্রীর পরকীয়া ও স্থানীয়দের ‘ছেলেধরা’ গুজবের সস্তা বলি হয়ে পৃথিবী ছাড়তে  হলো এই অসহায় বাবার।

স্থানীয় গণমাধ্যম  সুত্রে জানা যায়, সিরাজকে মেয়ের সাথে দেখে শামসুন্নাহার ও সোহেল  প্রথমে তাড়িয়ে  দিতে চেয়েছিল। কিন্ত সিরাজ যেতে না চাওয়ায় সোহেল প্রথমে এসে মারধর করে। একপর্যায়ে  ছেলেধরা বলে স্থানীয়দের হাতে ছেড়ে দেয় তারা।  লোকজন তখন কিছুই যাচাই না করে সিরাজকে গণপিটুনি দেই। ঘটনার প্রায় ১ঘন্টার পর  সিদ্দিরগঞ্জ থানার পুলিশ এসে মুমুর্ষু সিরাজকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

শুধু সিরাজ নয়, গত ৩ দিনে সারা দেশে ছেলেধরা সন্দেহে গণমাধ্যমে  প্রায় ৪০ টি মতো গণপিটুনির সংবাদ দেখলাম। এরমধ্যে আজ ( ২২ জুলাঈ) ১জন সহ মোট মারা গেছেন ৬ জন। বাকিদের অধিকাংশের অবস্থায় আশঙ্কাজনক। প্রায় সব ঘটনা এমনই,  লোকজন প্রথমে তাদের ছেলেধরা সন্দেহে পিটুনি দিলেও পরে দেখা যাচ্ছে ভুক্তভোগীদের কেঊ মানসিক প্রতিবন্ধী, কেউ স্মৃতিশক্তি হা্রানো ভবঘুরে। আবার অনেকে ছেলেধরা গুজবের সুযোগে নিরীহ সিরাজের মতো প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছেন।

আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো, পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে গণপিটুনির শিকার হচ্ছেন। এই নিয়ে দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যম গুলোতে ১৫- ১৬ জন নারী হামলার শিকার হয় বলে জানা যায়। এর মধ্যে শুক্রবার সাভারের তেঁতুলঝাড় এলাকায় এক অজ্ঞাত পরিচয়ের নারীকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয় যুবকরা। তবে ঘটনার একদিন পর রবিবার জানা যায়, রহিমা বেগম নামে ওই মহিলা আসলে একজন মানসিক প্রতিবন্ধী।

এদিকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে  নিহত ঢাকার বাড্ডায় তাসলিমা বেগম রেনু নামে এক নারীর  করুণ মৃত্যু কাঁদিয়েছে সারা দেশের মা্নুষকে। শনিবার (২০ জুলাই) ৪ বছরের মেয়ে তুবাকে স্কুলে ভর্তি করাতে গেলে  ছেলেধরা বলে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করে দুষ্কৃতিকারীরা। স্বামী পরিত্যক্তা এই শিক্ষিত নারী জীবনযুদ্ধে না হারলেও নষ্ট সমাজের অজ্ঞতা ও কূপমুন্ডকতার কাছে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেন।

 

জানা যায়, সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও ছেলেধরা সন্দেহে কথিত  গণপিটুনির শিকার হয়েছেন অনেকে। এরমধ্যে ২০ জুলাই শনিবার বান্দরবান সদরে হাফসা নামে এক রোহিঙ্গা নারীকে ধর্ষণের পর বখাটেরা ছেলেধরা বলে পিটুনি দিয়েছেন। একই দিন খাগড়াছড়ির গুইমারা ও কক্সবাজারের মহেশখালীতে আরো ২ জন মানসিক  প্রতিবন্ধী নারী ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হন । পাশাপাশি রাউজান, ফটিকছড়ি, সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, মিরসরাই ও রাংগুনিয়ায়ও ছেলেধরা সন্দেহে নিরাপরাধ মানুষরা মারাত্মক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

 

‘পদ্মা সেতু তৈরি করতে ১ লাখ শিশুর মাথা লাগবে। তাই সারা দেশে পুলিশ ও সরকারের লোকেরা বাচ্চাদের মাথা কেটে  নিচ্ছে।‘ চলতি মাসের শুরুর দিকে এমন একটি গুজব ছড়িয়ে  সারা দেশে আতঙ্ক তৈরি করে একটি মহল। সাধারণ মানুষও না বুঝে এসব গুজবে কান দেয়ায় পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে উঠে। তবে ১৮ জুলাই নেত্রকোণায় শিশুর মাথাসহ আটক হয়ে রবিন নামে এক রিক্সাচালকের জনতার পিটুনিতে নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে উঠে। যদিও পরে জানা যায়, রবিন আরেক রিক্সাচালক আলকাস মিয়ার সাথে শত্রুতার কারণে তার ৮ বছরের ছেলেকে গলা কেটে হত্যা করে। এর সাথে পদ্মা সেতুর জন্য মাথা সংগ্রহের কোন সম্পর্ক  নেই। তাছাড়া ওই যুবক সেসময় মাতাল অবস্থায় ছিলো।

এখন আমার বলতে দ্বিধা নেই যে,  পদ্মা সেতুর জন্য ছেলেধরা হচ্ছে কথাটি সম্পূর্ণ গুজব । এর সাথে  সত্যের কোন লেশ নেই। তবে যে গুজব রটেছে সেটা  সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। আসল ঘটনা কি, কেন এমনটা রটেছে, কারা এই গুজব ছড়াচ্ছে, কেন ছড়াচ্ছে তা জাতির কাছে স্পষ্ট করতে হবে। যারা গুজব রটাচ্ছে , তাদের খোঁজে বের করতে হবে।   শুধু কয়েকটি  বিবৃতি আর পত্র পত্রিকায় বিজ্ঞাপন  দিয়েই এমন ঘটনায় প্রশাসন তথা  রাষ্ট্র  দায় সারতে পারেনা।  পাশাপাশি মূলধারার পাশাপাশি সব গণমাধম এই ঘটনা নিয়ে তথ্যবহুল সংবাদ প্রচার করে গঠনমুলক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

আর রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমরা সচেতন নাগরিকদেরও এজন্য  এগিয়ে আসতে হবে। চিলে কান নিয়েছে বলে পাজি চিলের পেছনে না ছুঁটে সত্যটা জানার চেষ্টা  করতে হবে। না হয় এই জাতির কিছুতেই  মুক্তি মিলবেনা।  আপনারা বলুন,  পাশবিকতার  শিকার রেনুর অবুঝ মেয়েটা আমাদের ক্ষমা করবে ?   মোটেই  না। আর  রেনু , সিরাজরা তো ক্ষমা করার প্রশ্নই আসেনা। তাদের আত্নাগুলো একদিন ভূত হয়ে এই জাতির গলা টিপে ধরবে।

অতএব আসুন, সচেতন হই। গুজব না ছড়ায়, গুজবে কান না দেই।

 

লেখক :  নারী উদ্যোক্তা ও সাংবাদিক

প্রকাশক :  চট্টলানিউজ ২৪ ডটকম

print